Let's express...

Breaking

Friday, November 18, 2022

জলবায়ূ পরিবর্তন এবং আমাদের শিশু



সুনামগঞ্জ থেকে নিউ ইয়র্ক

“ অন্তর্ভূক্তিঃ সকল শিশুর জন্য” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগামী ২০ নভেম্বর ২০২২ পালিত হবে বিশ্ব শিশু দিবস। ২০ নভেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু দিবস হলেও দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে আলাদা তারিখেও শিশু দিবস উদযাপন করা হয়। যেমন- বাংলাদেশে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মদিনে শিশু দিবস উদযাপন করি, আবার পাশের দেশ ভারতে জওহরলাল নেহেরুর জন্মদিনে ১৪ নভেম্বরে শিশু দিবস পালন করা হয়, তুরস্কে সেটা পালিত হয় ২৩ জুন। তবে জাতিসংঘ এবং তার অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনসমূহ ২০ নভেম্বরকে বিশ্ব শিশু দিবস হিসেবে উদযাপন করে। জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব শিশু দিবসকে সামনে রেখেই তাই আমাদের আজকের এই আলোচনার সূত্রপাত।

এবারের শিশু দিবসটি যখন উদযাপন হতে যাচ্ছে তখন দুনিয়ার দরজায় কড়া নাড়ছে এক আসন্ন সংঘাত, দুনিয়ার কোণায় কোণায় শোনা যাচ্ছে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। দুনিয়াব্যাপী মরণঘাতী মহামারীর আঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই- আমাদের সামনে এই সংকট মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষত বুকের পাঁজরে নিয়ে আমরা ব্যথায় কাহিল- তার মধ্যে “গোদের উপর বিষফোঁড়া’র মতো এই সভ্যতার সংকটগুলো আমাদেরকে নতুন ধরণের জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। দুনিয়ার ক্ষমতাধর দেশগুলোর এই যুদ্ধংদেহি মনোভাব, মানুষের সীমাহীন লোভ, ভোগের সীমাহীন আকাঙ্খা আমাদের অতিসাধের এই ‘পৃথিবী’র অস্তিত্বকেই সংকটাপন্ন করে তুলছে। তাহলে পৃথিবীর এই অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে এই- এখান থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় কি? সে উত্তরও আমাদের অজানা নয়- কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারলেই শুধু আমরা এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি। তবে নতুন দিনের এই নতুন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের নতুন দিনের প্রজন্মকেও তো তৈরি রাখতে হবে!

জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘শিশু’ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অদ্ব্যার্থ ঘোষণা-

‘ যে শিশু ভুমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে

তার মুখে খবর পেলুমঃ

সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,

নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার

জন্মমাত্র সুতীব্র চিতকারে।’

সুকান্ত’র ‘নতুন বিশ্বে’র এক নাগরিক সুনামগঞ্জের নবম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রী গেলো বছর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রীকে একটি মর্মস্পর্শী প্রশ্ন রেখেছিলো- “ আচ্ছা মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, আপনি কি আমাদের বলতে পারেন- আগামী ৩০ বছর পর আমরা হাওরে বেঁচে থাকবো কি না? নাকি আমাদেরকে জমির খোঁজে পানিতে মাছের মতো সাঁতার কাটতে হবে?” প্রশ্নটি খুব যে অবান্তর নয় সেটা প্রমাণ হতে একবছরও লাগে নি। এবছর সিলেট অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা তার স্বাক্ষী দিয়ে গেছে। এ বন্যার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে- তবে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ও যে তার অন্যতম কারণ সে ব্যপারে নিশ্চয় কারো দ্বিমত নেই?

সুনামগঞ্জ থেকে এবার আমরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে নিউইয়র্ক চলে যাবো। সেখানেও একই ধরণের প্রশ্ন করেছেন- নতুন দিনের আরেক নাগরিক, গ্রেটা থুনবার্গ। ২০১৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের প্রধান অফিস নিউ ইয়র্কে যখন সে এই বক্তব্যটি দেয় তখন তার বয়স ১৬ বছর। মানে সেও একজন শিশু। একজন শিশু হিসেবে বিশ্ব নেতাদের প্রতি যে সে সন্তুষ্ট নয় সেটা সে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে। শুধু যে অসন্তুষ্ট এমন নয়, তাদের সাহস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সে। ফলে গ্রেটা থুনবার্গ এর সেই বক্তব্যটি “হাউ ডেয়ার ইউ’ শিরোনামেই জনপ্রিয়তা পায়। সেই বক্তব্যের একটা জায়গায় গ্রেটা থুনবার্গ বলেছে- “ আপনারা বলেন যে আপনারা আমাদের কথা শুনছেন এবং ব্যপারটির (জলবায়ু পরিবর্তন) গুরুত্ব বুঝতে পারছেন।... আমি এগুলো বিশ্বাস করি না। কারণ সত্যিই যদি আপনারা যদি সত্যিই পরিস্থিতি বুঝে থাকেন এবং তারপরেও কাজ করতে ব্যর্থ হন তাহলে আপনারা শয়তান। এবং এ কারণেই আমি আপনাদের বিশ্বাস করতে চাই না।” সুনামগঞ্জ থেকে নিউ ইয়র্ক, সাতক্ষীরা থেকে ভ্যানিস পৃথিবীর প্রত্যেকটি কোণাই ধিরে ধিরে আমাদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার

২০ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এখন পর্যন্ত সর্বজনগ্রাহ্য শিশু অধিকার দলিল। যে দলিল সম্পর্কে শিশুদের নিয়ে কাজ করা দুনিয়ার বৃহত্তম সংগঠন  ইউনিসেফ তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে- “এটি এখন পর্যন্ত তৈরি শিশুদের অধিকারের সবচেয়ে সম্পূর্ণ বিবৃতি এবং ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যাপকভাবে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি।” এই দলিলটিতে স্বাক্ষর করেছে ১৯১ টি সদস্য রাষ্ট্র। এই দলিলের রয়েছে ৫৪ টি ধারা। যে ধারায় শিশুদের অধিকার, রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায় এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিব পর্যন্ত, শিশু অধিকার বাস্তবায়নে কার কী করণীয় সবকিছু বিষদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো- যে ২৩ টি সদস্য রাষ্ট্র এই সনদের অনুসমর্থনে স্বাক্ষর করেছিলো বাংলাদেশ তার একটি।

তবে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের বহু আগে ১৯৭৪ সালেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই বাংলাদেশ একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু আইন তৈরি করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে জাতীয় শিশু নীতি এবং ২০১৩ সালে শিশু আইন ২০১৩ পাস করা হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং ১৯৭৪ সালের শিশু আইনের সাথে সংগতি রেখেই এ আইন প্রণয়ন করা হযেছে। এ আইনেও একই রকমভাবে শিশু এবং তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

দুনিয়ার সামনে এক নতুন ধরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ভাচুয়াল রিয়েলিটি, সোশ্যাল মিডিয়া, কিশোর গ্যাং, বিট কয়েন, অনলাইন গেমিং এই শব্দগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে একেবারেই নতুন। এই গত কয়েক বছর আগেও এদেশের মানুষের কাছে এ শব্দগুলো ছিলো একেবারেই অপরিচিত। তার উপর করোনা মহামারীর অভিঘাত তো আছেই। তাহলে নতুন এ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রস্তুতি আসলে কতটুকু?

শিশুদের প্রোম্যাক্স মস্তিষ্ক এবং আমাদের ন্যুব আয়োজন

২০২১ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফ বাংলাদেশ এর একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে- “ শিশুদের মৌলিক চারটি সংখ্যাগত দক্ষতা পূরণ করার ক্ষমতা ২৫.৮% যা ২০১৯ সাল থেকে কম। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে প্রথম আলো ইউএনএফপিএ’র বরাত দিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়েছে- ‘এক বছরে বাল্যবিবাহ বেড়েছে ১০ গুণ।’ সময় সংবাদের অনলাইন ভার্সন ২২ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে প্রকাশিত এক সংবাদে বাংলাদেশ কা্উন্সিল ও লেবার রাইটস সাংবাদিক ফোরাম এর বরাত দিয়ে জানিয়েছে- বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখ। তাহলে এ পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী?

 

আমরা আবার একটু ফিরে দেখতে চাই জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদটিকে। এ সনদের চারটি মূলনীতির ১ নম্বর মূলনীতিতে বলা হয়েছে- শিশুর বৈষম্যহীনতার কথা। শিশুর বৈষম্যহীনতার কথাটিকে মাথায় রেখে আমরা একটু ঘুরে আসতে চাই বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল থেকে। যেখানে বছরে প্রায় দুই মাসের কাছাকাছি সময় প্রাকৃতিক কারণেই ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। আমরা ঘুরে দেখতে চাই বাংলাদেশের কোচিং সেন্টারগুলো, প্রাইভেট সেন্টারগুলোকে যেখানে- শুধুমাত্র টাকা দিলেই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করা যায়। শিক্ষাবাণিজ্যকে অব্যাহত রেখে কি করে দেশের সকল শিশুর জন্য বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে- তা আমাদের কাছে দুর্বোধ্য । একই রকম দুর্বোধ্য মোবাইল ফোন এবং কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে কিভাবে আমরা আমাদের সন্তানকে রক্ষা করতে পারি? শুধুমাত্র সরকারি আইন-নির্দেশনা, শিক্ষক-অভিভাবকদের উপর দায় চাপিয়েই কি আমরা একটি আগামীর যোগ্য প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারবো? নিশ্চয় নয়- আমরা আমাদের শিশুদেরকে যেভাবে অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছি এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার ধারা অব্যাহত রেখে কি আগামীর পৃথিবীটা আমাদের জন্য সুখকর হবে? খেলার মাঠগুলো দখল করে, শিশুদের মস্তিষ্কগুলোকে আমাদের বাণিজ্যের উর্বর ক্ষেত্র বানিয়ে, আমাদের ল্যাবরেটরি বানিয়ে কি আমরা শান্তিতে থাকতে পারবো?

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে একদিকে জলবায়ূ পরিবর্তনের বিনাশী অভিঘাত, জনসংখ্যা বৃদ্ধির অবশ্যম্ভাবী জটিলতা সেখানে আমাদের আগামী প্রজন্ম সুস্থ না হলে আমাদেরকে এক ঘোর অমানিশার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমরা যদি সেই অমানিশার অন্ধকারে নিমজ্জিত না হতে চাই তাহলে আমাদেরকে এই তন্দ্রা ভাঙতে হবে। আমাদের শিশুদের জন্য রেখে যেতে হবে একটা নিরাপদ পৃথিবী। মধ্যযুগের কবি যেমন বলেছিলেন- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। আমাদের শিশুদের জন্য ‘দুধেভাতে’র পৃথিবীটা তৈরি করা আমাদেরই দায়িত্ব। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পূর্বোল্লিখিত কবিতার আরেকটু অংশ দিয়েই শেষ করতে চাই-

“চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি

নবজাতকে কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

 

 

আওলাদ হোসেন রনি

১৫ নভেম্বর ২০২২ 

গোডাউন মোড়, রূপসা, খুলনা।  

No comments:

Post a Comment